বাংলাদেশ মানেই সবুজ। চোখে পড়া ধানের ক্ষেত, নদীর বাঁক, আর মানুষের অদম্য স্বপ্ন।
এই দেশের জন্ম হয়েছিল ১৯৭১ সালে, অসংখ্য ত্যাগ আর রক্তের বিনিময়ে। স্বাধীনতা এসেছিল, কিন্তু স্বাধীন দেশের স্বপ্নগুলো বাস্তব রূপ পেতে সময় লেগেছে। বিশেষ করে শিশুদের জন্য নিরাপদ, সুন্দর আর গড়ে ওঠার মতো একটি পরিবেশ তখন সহজে তৈরি হয়নি।
এই বাস্তবতা থেকেই একদল স্বপ্নবান মানুষ ভাবলেন, “দেশ বদলাতে হলে শুরু করতে হবে শিশুদের দিয়ে।”
সেই ভাবনার ফলই ফুলকুঁড়ি আসর।
একটি ভাবনা থেকে একটি আন্দোলন
১৯৭৪ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ফুলকুঁড়ি আসরের যাত্রা শুরু। উদ্দেশ্য একটাই—আজকের শিশুদের এমনভাবে গড়ে তোলা, যেন তারা আগামী দিনের দায়িত্ব নিতে পারে মাথা উঁচু করে। ফুলকুঁড়ি বিশ্বাস করে, ভালো মানুষ না হলে ভালো দেশ হয় না।
এই দর্শনের কেন্দ্রে আছে একটি সহজ কিন্তু গভীর কথা—
“নিজেকে গড়ো”
নিজেকে গড়তে পারলেই সমাজ বদলানো সম্ভব, বিশ্ব বদলানো সম্ভব।
পাঁচটি মূল স্তম্ভ, একটি মানুষ
ফুলকুঁড়ি আসর শিশুদের গড়ে তোলে পাঁচটি মূল নীতির ওপর দাঁড়িয়ে—
ঐক্য, শিক্ষা, চরিত্র, স্বাস্থ্য এবং সেবা।
এই পাঁচটি গুণ একসাথে মিললেই তৈরি হয় একজন পরিপূর্ণ মানুষ।
শেখা শুধু বইয়ে সীমাবদ্ধ নয়
ফুলকুঁড়ির শিক্ষা মানে শুধু পরীক্ষার ফল নয়। এখানে আছে সাহিত্যচর্চা, বিতর্ক, তাৎক্ষণিক বক্তৃতা, গল্প বলা, ভাষা শেখা, নেতৃত্ব বিকাশের কর্মশালা। শিশুদের ভাবতে শেখানো হয়, কথা বলতে শেখানো হয়, আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে নিজের মত প্রকাশ করতে শেখানো হয়।
সংস্কৃতির সঙ্গে বেড়ে ওঠা
সংস্কৃতি ছাড়া মানুষ অসম্পূর্ণ। তাই গান, আবৃত্তি, অভিনয়, নাটক, সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, গুরুত্বপূর্ণ দিবস পালন—সবই ফুলকুঁড়ির নিয়মিত চর্চার অংশ। শিক্ষা সফর, নৌভ্রমণ কিংবা দলগত কার্যক্রম শিশুদের শেখায় একসাথে চলতে।
শরীর ও মন—দুটোরই যত্ন
মাঠকর্ম, র্যালি, মার্চপাস্ট, খেলাধুলা, শারীরিক ব্যায়াম—এসবের মাধ্যমে শিশুদের শরীর যেমন শক্ত হয়, তেমনি মনেও জন্ম নেয় শৃঙ্খলা ও আত্মবিশ্বাস।
প্রকৃতি, শিল্প আর বিজ্ঞান হাতে-কলমে
গাছ লাগানো, বাগান করা, আঁকা, হস্তশিল্প, আর্ট একাডেমি—এগুলো শিশুদের সৃজনশীল করে তোলে।
আর বিজ্ঞান? ফুলকুঁড়ি চায় শিশুরা কৌতূহলী হোক। বিজ্ঞান কুইজ, আলোচনা, বিজ্ঞান মেলা—সব মিলিয়ে বিজ্ঞান হয়ে ওঠে আনন্দের বিষয়, ভয় নয়।
সমাজের জন্য কিছু করা শেখা
চক্ষু শিবির, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, রক্তের গ্রুপ নির্ধারণ, প্রাথমিক চিকিৎসা শেখা, সাক্ষরতা কার্যক্রম—শিশুরা ছোট বয়সেই শিখে যায়, সমাজ মানে শুধু “আমি” নয়, “আমরা”।
নেতৃত্বের প্রথম পাঠ
১৯৮৫ সাল থেকে ফুলকুঁড়ির নেতৃত্ব ক্যাম্পগুলো শিশুদের জীবনে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে। শিশু সংসদ, আলোচনা, চ্যালেঞ্জিং আওয়ার, হাইকিং, কর্মশালা—এই অভিজ্ঞতাগুলো শিশুদের ভেতরে দায়িত্ববোধ আর আত্মনির্ভরতা গড়ে তোলে।
ফুলকুঁড়ি কাগজে-কলমে নয়, মঞ্চেও
১৯৭৮ সাল থেকে প্রকাশিত মাসিক শিশু-কিশোর পত্রিকা ‘ফুলকুঁড়ি’ শুধু একটি ম্যাগাজিন নয়, এটি বহু লেখক ও চিন্তাশীল মানুষের প্রথম প্ল্যাটফর্ম।
কিশোর থিয়েটার, পথনাটক, পুরস্কারপ্রাপ্ত নাটক—ফুলকুঁড়ির শিশুরা সংস্কৃতির ময়দানে নিজেদের ছাপ রেখে চলেছে।
স্বীকৃতি অনুপ্রেরণা আনে
২০০৬ সাল থেকে দক্ষতা ব্যাজ, আর ২০০৭ সাল থেকে অগ্রপথিক ব্যাজ—এই স্বীকৃতিগুলো শিশুদের শেখায়, পরিশ্রম কখনো বৃথা যায় না।
যারা পিছিয়ে, তাদের সঙ্গেই পথচলা
ফুলকুঁড়ি শুধু সুবিধাভোগী শিশুদের জন্য নয়। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা, বৃত্তি, স্বাস্থ্যসেবা এবং শিশু ভবনের স্বপ্নও এই সংগঠনের চিন্তার অংশ।
শেষ কথা নয়, শুরু
ফুলকুঁড়ির স্বপ্ন একটাই—
একটি সুন্দর পৃথিবী, যেখানে সততা, ন্যায় আর ভালোবাসা রঙ ছড়াবে।
যেখানে শিশুরা বড় হবে মানুষ হয়ে, আলো হয়ে।
ফুলকুঁড়ি আসর সেই আলোরই বীজ বপন করছে।
আজ নয়, কাল নয়—অনেক দিন ধরে।
আর সেই সুবাস ছড়িয়ে পড়ছে দেশ ছাড়িয়ে, সীমানার বাইরে।
খুঁজে দেখো -----
জনপ্রিয় লেখা
-
পানিভর্তি গ্লাস হাতে নিয়ে ক্লাশ আরম্ভ করলেন এক প্রফেসর। হাত দিয়ে গ্লাসটি উঁচু করে ধরে জিজ্ঞেস করলেন, “এই গ্লাসটির ওজন কত বলতে পার?” । ৫০ ...
-
আমাদের অধিকাংশেরই মন মানসিকতা এমনভাবে গড়ে ওঠেছে যে, চাকরগিরী কিংবা কেরানিগিরী করা ছাড়া স্বাধীন উদ্যোক্তা হওয়ার চিন্তাও যেন আমরা করতে পা...
-
জাপানিজরা বাচ্চা থাকতেই পরিশ্রম করতে শিখে। উন্নত দেশ বলে ওদের মুখে সোনার চামচ দিয়ে খাবার তুলে দেয় না বাবা মায়েরা। স্কুলে ওরা শুধু পড়াশ...
-
সব ধরনের তৃণলতার মাটির ভাঙন রোধের ক্ষমতা সমান নয়। অস্ট্রেলিয়া, কম্বোডিয়া, চীন, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ভারত, জিম্বাবুয়ে, পৃথিবীর এ মাথা...
-
তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলেছেন, পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতি ইঞ্চি মাটিকে ডিজিটাল কানেকটিভিটির আওতায় আনা হবে। ...
-
মাইক্রোসফটের উইন্ডোজ ৭ ল্যাপটপ এবং ডেস্কটপ কম্পিউটারে এটি চালাতে ৩২ এবং ৬৪ বিটের জন্য যথাক্রমে ১ এবং ২ গিগাহার্টজ প্রসেসর লাগবে। র্...
-
একটি ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়েই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যা করা হয়েছিল। এই যড়যন্ত্র ...
-
নিজের পরিবারের দরিদ্রতা নিয়ে আফসোস না করে, নিজের দরিদ্রতার দোহাই দিয়ে অন্যের কাছ থেকে সুযোগ সুবিধা গ্রহনের চেষ্টা না করে, নিজেকে প্রস্তু...





